সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করুন -
অস্টিওপরোসিস কী? হাড় ক্ষয় কেন হয়, সেরে ওঠার উপায় কী?
অস্টিওপোরোসিস বা অস্টিওপোরেসিস (ইংরেজি: Osteoporosis) হল ক্যালসিয়াম এর অভাব জনিত একটা রোগ।
এটি হাড়ের এমন এক ধরণের ক্ষয় রোগ যা আপনার হাড়কে ভীষণ দুর্বল করে ফেলে, যার কারণে সামান্য আঘাতেই ভেঙ্গে যায় বা ফেটে যায়। বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির মতে, দেশটির মোট জনসংখ্যার অন্তত তিন শতাংশ অস্টিওপরোসিসে আক্রান্ত এবং পুরুষের তুলনায় নারীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি ।
চিকিৎসকরা বলছেন এই রোগে আক্রান্তদের অনেকেই তাদের রোগ সম্পর্কে জানেন না এবং আক্রান্তদের সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে এমনকি ছয় মাসেই মৃত্যু ঘটতে পারে।
সোসাইটির গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যদিও তাদের অনেকের জানাই নেই যে তারা হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক একেএম সালেক বলছেন ৫০ বছর বয়সী যারা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের প্রতি দশজনের নয়জনই নারী। তবে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে সাধারণত এ অনুপাত হয় ৬:৪ বা ৭:৩।
চিকিৎসকরা বলছেন তাদের ধারণা আগামী পাঁচ বছরে নন-কমিউনিকেবল যেসব রোগে মানুষ বেশি আক্রান্ত হয় তার মধ্যে শীর্ষ পাঁচে এই হাড় ক্ষয় রোগ উঠে আসবে।
“হার্ট, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও ফুসফুসের সমস্যার পর হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি হবে বলে আমরা ধারণা করছি,” বলছিলেন মিস্টার সালেক।
হাড় ক্ষয় কেন হয়?
কারও যদি ধূমপান, অতিরিক্ত মদপান ও মাদক সেবনের মতো অভ্যাস থাকে, সেটিও অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ। আবার ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে, হাইপার থাইরয়েডিজম বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকলে, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের কারণে যেকোনো বয়সীদের অস্টিওপরোসিস হতে পারে।
অস্টিও অর্থ হাড় এবং পরোসিস অর্থ পোরস বা ছিদ্র। সে হিসেবে অস্টিওপরোসিস বলতে বোঝায় যখন হাড়ে বেশি পরিমাণে ছিদ্র থাকে।
হাড়ে বেশি ছিদ্র থাকা মানে বোন ডেনসিটি বা হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া। এতে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই হাড় ভেঙ্গে যাওয়া বা ফ্র্যাকচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাড় দুর্বল হওয়ার এই স্বাস্থ্যগত অবস্থাই অস্টিওপরোসিস।
হাড়ের দু’টি অংশ থাকে। ওপরের শক্ত আবরণটিকে বলা হয় কমপ্যাক্ট বোন। ভেতরে স্পঞ্জের মতো ছিদ্র ছিদ্র করা স্তরটিকে বলা হয় স্পঞ্জি বোন বা ট্রেবাকুলার বোন।
অস্টিওপরোসিস হলে হাড়ের ওপরের আবরণ বা কম্প্যাক্ট বোন অনেক পাতলা হয়ে যায় এবং স্পঞ্জি অংশটির ছিদ্র বেড়ে যায় বা ঘনত্ব কমে যায়, যা হাড়কে দুর্বল করে ফেলে।
হাড় সাধারণত একদিকে ক্ষয় হতে থাকে আরেকটি গঠন হতে থাকে। যদি ক্ষয় হওয়ার গতি, নতুন হাড় গঠন হওয়ার গতির চাইতে কমে যায়, তখনই অস্টিওপরোসিস হয়।
কম্প্যাক্ট বোনের গঠন প্রতি ১০ বছর অন্তর আর স্পঞ্জি বোন প্রতি তিন বা চার বছর পর পর বদলায়।
মূলত বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড় দুর্বল হতে থাকে যা বার্ধক্যের একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে কিছু মানুষের এই হাড় ক্ষয়ের প্রবণতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্যমতে, মানুষের হাড় সবচেয়ে বেশি মজবুত অবস্থায় থাকে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে। এরপর থেকে হাড় দুর্বল হতে শুরু করে।
উপসর্গ :
আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আপনার অস্টিওপরোসিস আছে কিনা সেটা আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাড় ভাঙলে বা ফ্র্যাকচার হলেই কেবল বিষয়টি সামনে আসে।
প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না কিন্তু পরিস্থিতি যখন জটিল রূপ নেয় তখন রোগীর-
ঘাড়ে, কোমরে, মেরুদণ্ডে প্রতিনিয়ত ব্যথা হয়
পেশী ব্যথা করে বা পেশী দুর্বল লাগে
বয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চতা কমে যায় বা কুঁজো হয়ে যায়, কারণ হাড় ক্ষয় হওয়ার কারণে মেরুদণ্ড শরীরের ভার নিতে পারে না, এজন্য মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে শরীর ঝুঁকে আসে, অনেক সময় হাড় ভেঙে যায়
পাঁজরের হাড় নীচের দিকে ঝুলে পড়ে
হাড় না ভাঙ্গা পর্যন্ত অস্টিওপরোসিস সাধারণত কষ্টকর হয় না, তবে মেরুদণ্ডের হাড় একবার ভাঙলে সেটা দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে হয়।
পরীক্ষা:
অস্টিওপরোসিস পরীক্ষা করা হয় ডুয়েল এনার্জি এক্স রে অ্যাবজরপ-শিওমেট্রি বা সংক্ষেপে ডেক্সা স্ক্যানের মাধ্যমে।
এখানে রোগীকে শুইয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ স্ক্যান করা হয় যা সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত পদ্ধতি। এটা করতে ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে, এক্ষেত্রে শরীরের যে অংশটি স্ক্যান করা হচ্ছে তার উপর সময় নির্ভর করে।
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক তরুণের হাড়ের সাথে তুলনা করে রোগীর হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ করা হয়। এই গণনা করা হয় টি স্কোর দিয়ে।
পরীক্ষায় রোগীর টি স্কোর যদি মাইনাস দুই দশমিক পাঁচ বা তার কম আসে, তাহলে বুঝতে হবে তার অস্টিওপরোসিস আছে।
এছাড়া পরীক্ষায় রোগীর হাড়ের পরিস্থিতি কয়েকটি গ্রেডে ভাগ করা হয়। রোগীর হাড়ের অবস্থা কোন গ্রেডে আছে, রোগীর বয়স, লিঙ্গ, ভবিষ্যতে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কতোটা আছে, আগে হাড় ভেঙেছিল কিনা সেটার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে।
আপনার যদি অস্টিওপেনিয়া অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় রোগটি ধরা পড়ে তাহলে আপনার হাড় সুস্থ রাখতে এবং অস্টিওপরোসিস হওয়ার ঝুঁকি কমাতে আপনি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন।
যদি অস্টিওপরোসিস ধরা পড়েই যায় তাহলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়ার পাশাপাশি চলাফেরায় সাবধান হতে হবে এবং নিয়মিত চোখের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করাতে হবে।
প্রতিরোধ:
অস্টিওপরোসিস প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধের ওপর বেশি জোর দিতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই রোগের ঝুঁকি যেহেতু বয়সের সাথে বাড়ে তাই আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। আমরা বয়স্কদের শুয়ে বসে থাকতে বলি। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে শারীরিক পরিশ্রম করা বেশ জরুরি।
যারা নিয়মিত কায়িক শ্রম করেন বা শরীরচর্চা করেন তাদেরও হাড়ের গঠন মজবুত হয়, হাড় ক্ষয়ের গতি কমে যায় এবং হাড় গঠনের গতি বেড়ে যায়।
রক্তের ক্যালসিয়াম, ফসফেট সেইসাথে অ্যাস্ট্রোজেন, টেস্টোটেরন ও গ্রোথ হরমোন হাড়ের গঠনে সাহায্য করে।
তাই ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, প্রোটিন, ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যান্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেলে সেইসাথে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খেলে, অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিদিন অন্তত ১০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতেই হবে।
সেইসাথে ধূমপান ও মদপানের অভ্যাস থাকলে তা পরিত্যাগ করতে হবে।
চিকিৎসা:
হাড় মজবুত করার ওষুধ দিয়ে অস্টিওপরোসিসের চিকিৎসা করা যায়।
প্রতিনিয়ত আমাদের যে হাড় গঠন হচ্ছে সেটা কেমন মজবুত হবে, সেটা নির্ভর করবে শরীরের সেরাম ক্যালসিয়াম লেভেলের ওপর।
মানবদেহের প্যারাথাইরয়েড হরমোন ও ক্যালসাটোনিন হরমোন আর ভিটামিন ডি এই সেরাম ক্যালসিয়াম লেভেলকে প্রভাবিত করে।
চিকিৎসকরা সাধারণত রোগীর পরিস্থিতি বুঝে, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট, ন্যাসাল স্প্রে, সাপ্তাহিক বা মাসিক ট্যাবলেট, বছরে একবার হরমোনাল ইনজেকশন, হরমোনাল ওষুধ, ইত্যাদি প্রেস্ক্রাইব করে থাকেন।
মেনোপজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এমন নারীদের ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে অ্যাস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়ানো হয় যা হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে এসব ওষুধের বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সে বিষয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেয়া দরকার।


























